মা
মিহুলি চ্যাটার্জী
স্কুল থেকে ফেরার পর একদণ্ড বিশ্রামের অবকাশ দাওনি। নিজে হাতে খাইয়ে ৫০০ ঘুঙুরের ব্যাগ কাঁধে বয়ে আমার হাত ধরে নিয়ে গেছ। সারাদিনের পরিশ্রান্ত দুটো চোখে ঘুম এসেও উড়ে গেছে আমার ঘুঙুর বাঁধা পায়ের তালে। বার তিরিশেক গিয়েছিলাম দীনবন্ধু মঞ্চে। তোমার আশীর্বাদে কখনই দর্শকের আসনে বসতে হয় নি আমায়। স্টেজ থেকে কয়েক শো দর্শক কে বার বার দেখার সুযোগ তুমিই করে দিয়েছ আমাকে।
সম্পূর্ণ অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে সমস্ত আলো যখন আমার ওপর , সে অসামান্য অনুভূতি তোমারই জন্য পেয়েছি এই জীবনে। বিপুল আলোর মধ্যে থেকে স্টেজের বাইরের অন্ধকারে কাউকে চিনে উঠতে না পারলেও , ঐ একটা মুখ, আনন্দে উজ্জ্বল দুটো চোখ কখনই চিনতে ভুল হয় নি আমার। তোমার ঐ ঘটের জমানো পয়সা ছাড়া কার সাধ্য ছিল আমাকে ভারত বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী র সাথে এক মঞ্চে দাঁড় করায় ! তার সাথে লয় আমি মেলালেও , দিনরাত অনুশীলন যে তুমিই করিয়েছো।
সেবার এলাহাবাদ থেকে আসা পরীক্ষক যখন সবার ওপর ক্ষিপ্ত , গুরুমাও আমায় নিয়ে আশঙ্কায়, তখনও তোমার অবিচল বিশ্বাস আমার ওপর। রেগে গিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়া লোকটা হঠাৎ চোখের পলক সরাতে পারছেন না। লয়, তাল , নাকি অভিনয় কোনটা পরীক্ষা করবেন,হঠাৎ দিশেহারা।
কোলবালিশ টা টেনে গুরুমাকে বলেন ,"কে ও ?এতক্ষণ কোথায় রেখেছিলেন একে ?" খিপ্ততার দাবদাহ তখন স্নিগ্ধ বাতাসে শান্ত , আমার অশান্ত তারানায়। উঠে দাঁড়িয়ে যখন আশীর্বাদ দিলেন, সেদিন তোমার চোখে জল দেখেছিলাম।
গর্বে , আনন্দে নিজের জীবনের সমস্ত না পাওয়া গুলো ধুয়ে গেছিলো কান্নায়।
দু ' দুটো বোর্ডের ডিস্টিংশন সার্টিফিকেটে দ্বিতীয় রো এ তোমার নামটাই যে সবচেয়ে উজ্জ্বল মা।
পরিস্থিতি আমাকে সেই পথ থেকে সরিয়ে আনলেও এক দিনের জন্যেও অভিযোগ করনি তুমি।তবে আলতা পড়া ঘুঙুর বাঁধা পা দুটো আবার বাজবে, সেদিনের অপেক্ষা তোমার আমার দুজনেরই , মা।


No comments:
Post a Comment